কূটনৈতিক প্রতিবেদক
৫ আগস্ট শেখ হাসিনা রাষ্ট্রের একটি স্তম্ভ বাংলাদেশের বিচার বিভাগের প্রতি বিদ্বেষ ছড়িয়েছেন এবং ভারত সরকার তা করতে দিয়েছে উল্লেখ করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বলেছেন, আমরা চাই আমাদের পুরো রাষ্ট্রের কাঠামোর প্রতি সব দেশ শ্রদ্ধাশীল হোক। আমরা আশা করব, আমাদের এই মনোভাব ভারত সরকার বুঝতে পারবে।
গতকাল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে ভারতের নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সৌজন্য সাক্ষাতের পর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে খলিলুর রহমান এ সব কথা জানান। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির উপস্থিত ছিলেন। হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর ভারতের প্রবীণ রাজনীতিক ও সাবেক মন্ত্রী দীনেশ ত্রিবেদী এই প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করলেন। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা যা ঘটিয়েছেন তার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছে কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে খলিলুর রহমান বলেন, এখানে দুঃখ প্রকাশের বিষয় নেই। একটা রাষ্ট্রের তিনটা স্তম্ভ থাকে- নির্বাহী বিভাগ, আইনসভা ও বিচার বিভাগ। বাংলাদেশের একটা উপযুক্ত আদালত হাসিনার বিচার করেছেন, তাকে দণ্ড দিয়েছেন। দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির বিষয়ে কী হয়? তাকে হেফাজতে নেয়া হয় এবং তার যদি কিছু বক্তব্য থাকে, আত্মপক্ষ সমর্থনের কিছু থাকলে সেটা আদালতে বলবে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমার ধারণা, ভারত বিষয়টি বুঝতে পেরেছে এবং আশা করব আমাদের রাষ্ট্রের কোনো স্তম্ভকে অবমাননা করার মতো কিছু তারা আর করবে না। ত্রিবেদীর সাথে গত রোববার আমার যা কথা হয়েছে, আমি কিছুটা হলেও আশ্বস্ত হয়েছি যে এই ঘটনার (দিল্লিতে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলন) পুনরাবৃত্তি হবে না। ত্রিবেদী আজকে প্রধানমন্ত্রীকেও একই ব্যাপারে আশ্বস্ত করেছেন।
প্রধানমন্ত্রীর সাথে ভারতীয় হাইকমিশনারের সাক্ষাৎ প্রসঙ্গে খলিলুর রহমান বলেন, দণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে প্রত্যর্পণে বিষয়টি উঠে এসেছে। আমরা ভারতকে প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার জন্য বলেছি। আমরা আশা করি, ভারত এ ব্যাপার ইতিবাচক দিকে এগোবে। এ ছাড়া শহীদ হাদির (ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক) সন্দেহভাজন হত্যাকারীরা ভারতে ধরা পড়েছে। আটককৃতদের দেশে ফিরিয়ে আনতে ভারত যেসব কাগজপত্র চেয়েছিল সবকিছু দেয়া হয়েছে। হাদি ইস্যুটি আমাদের জন্য অত্যন্ত স্পর্শকাতর। হত্যাকারীদের যত দ্রুত সম্ভব আমাদের কাছে প্রত্যর্পণ করার জন্য আমরা তাগাদা দিয়েছি।
সাক্ষাতে সীমান্ত হত্যা ও পুশইন নিয়ে আলোচনা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এগুলো খুব সংক্ষেপে আলোচনা হয়েছে। এ সব ইস্যু প্রধানমন্ত্রীর সাথে হাইকমিশনারের সৌজন্য সাক্ষাৎ পর্যায়ে আলোচনার জন্য থাকে না। তবে রোববার আমার সাথে দীনেশ ত্রিবেদীর বৈঠকে এসব বিষয় উঠে এসেছে। প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাতে দু’দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নেয়ার জন্য যে সহায়ক পরিবেশ দরকার, সেই ধরনের পরিবেশ সৃষ্টির ওপর গুরত্বারোপ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়া এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারতের আমন্ত্রণের বিষয়ে জানতে চাইলে খলিলুর রহমান বলেন, সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার জন্য আমি নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা দিতে পারছি না। তবে একটা বিষয় আমাদের বুঝতে হবে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দিল্লিতে ব্রিকসের আউটরিচ অধিবেশনে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে বিমসটেকের সভাপতি হিসেবে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়। তবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এর আগে বাংলাদেশের নতুন সরকার গঠনের দিন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়ে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। বাংলাদেশ এখনো আমন্ত্রণের বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।
প্রধানমন্ত্রীর সাথে ভারতীয় হাইকমিশনারের সাক্ষাতে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি বা অভিন্ন নদীর ইস্যুগুলো এসেছিল কিনা জানতে চাওয়া হলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এটা ছিল সৌজন্য সাক্ষাৎ। একজন প্রধানমন্ত্রী হাইকমিশনারের সাথে এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন না। তিনি বলেন, আমাদের প্রধানমন্ত্রী ভারতীয় হাইকমিশনারকে বাংলাদেশে স্বাগত জানিয়েছেন। হাইকমিশনার ত্রিবেদী প্রধানমন্ত্রীকে গত সপ্তাহগুলোতে বাংলাদেশে তার অভিজ্ঞতাগুলো তুলে ধরেছেন। এ ছাড়া সাক্ষাতে সংক্ষেপে কিছু বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
জনগণকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতে সম্পর্ককে সুদৃঢ় করতে চায় ভারত : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে সাক্ষাৎ প্রসঙ্গে ভারতীয় হাইকমিশন থেকে দেয়া বার্তা বলা হয়েছে, হাইকমিশনার ভারতের প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা জানান এবং বাংলাদেশের সরকার ও জনগণের সাথে ইতিবাচক, গঠনমূলক ও দূরদর্শী মনোভাব নিয়ে একত্রে কাজ করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন। তারা পারস্পরিক আগ্রহের বিষয়গুলোতে মতবিনিময় করেন এবং জনগণকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরো সুদৃঢ় করার উপায়গুলো নিয়ে আলোচনা করেন।