প্রথম কিস্তি
পাকিস্তানের বিভিন্ন প্রদেশে দু’সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে ব্যাপক সফর শেষে গত ২৪ জুলাই ঢাকা ফিরে এসেছি। বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইটে এর আগে ৯ জুলাই রাতে করাচি পৌঁছাই। সফরসঙ্গী হিসেবে আমার সঙ্গে ছিলেন আমার পুত্র ড. ফখরুল আমিন মোহাম্মদ হাসানুল বান্না এবং তারই ব্রাদার ইন ল, মানারাত আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসনের সহকারী অধ্যাপক ও ইসলামী আন্দোলনের তরুণ এক্টিভিস্ট আশিকুন্নবী। আমার পাকিস্তান সফরের ইচ্ছা দীর্ঘদিনের। পাঁচ দশকেরও বেশি সময়ের। ১৯৭১ সালের আগস্ট মাসের ৫ তারিখে আমি সর্বশেষ তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তান সফর করি। তখন আমরা পাকিস্তানের অংশ ছিলাম, পূর্ব পাকিস্তান। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান উভয়ে মিলে তখন দেশটির আয়তন ছিল ১০,২৯,৪৮৩ বর্গ কিলোমিটার (পশ্চিম পাকিস্তান ৮,৮১,৯১৩ বর্গকিলোমিটার + পূর্ব পাকিস্তান ১,৪৭,৫৭০ বর্গ কিলোমিটার)। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাদীনতা অর্জন করে। ফলে বর্তমানে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের চারটি প্রদেশ নিয়েই পাকিস্তান গঠিত এবং এর আয়তন কমে ৮,৮১,৯১৩ বর্গ কিলোমিটারে এসে দাঁড়ায়।
১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্টের আগে দুনিয়ার বুকে পাকিস্তান নামক কোনো রাষ্ট্র ছিল না। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভারতবর্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম এলাকাসমূহ নিয়ে পাকিস্তান এবং হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকা নিয়ে হিন্দুস্তান বা ভারত প্রজাতন্ত্র গঠিত হয়।
বাংলাদেশে পাকিস্তান শব্দটি নিয়ে কিছু সংখ্যক লোকের বিভ্রান্তি আছে। কেউ কেউ মনে করেন পবিত্র (পাক) স্থান অর্থে দেশটির নাম পাকিস্তান রাখা হয়েছে। আসল ঘটনাটি ভিন্ন। সেখানে পাক না পাকের কোনো কথা ছিল না। প্রকৃত কথা হচ্ছে ১৯৩০ সালে এলাহাবাদে অনুষ্ঠিত নিখিল ভারত মুসলিম লীগের ২১তম বার্ষিক অধিবেশনে মুসলিম জাগরণের কবি ও দার্শনিক আল্লামা ড. ইকবাল দ্বিজাতিতত্বের ধারণা পেশ করেন এবং সম্মেলনকে বুঝাতে সক্ষম হন যে, ধর্ম, বিশ্বাস, আচার-আচরণ, সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস ও চালচলন সবদিক থেকে হিন্দু এবং মুসলমানরা সম্পূর্ণ ভিন্ন ও আলাদা দুটি জাতি এবং ইসলাম পূর্ণাঙ্গ একটি জীবনব্যবস্থা। তিনি ভারতের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল বিশেষ করে পাঞ্জাব, সিন্ধু, বেলুচিস্তান ও উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ নিয়ে পৃথক মুসলিম রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব করেন এবং প্রস্তাবটি সম্মেলনে গৃহীত হয়। তার এ দর্শনের আলোকে যুক্তরাজ্যের ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র চৌধুরী রহমত আলী পাকস্তিান শব্দটি গঠন করেন। তিনি Punjab থেকে P, Afghanistann থেকে A, Kashmirথেকে K, Sindhu S এবং Baluchistan থেকে Stan শব্দাংশ নিয়ে Pakistan শব্দটি গঠন করে পরে শ্রুতিমধুর করার জন্য K এবং S এর মাঝখানে I দিয়ে Pakistan শব্দটি গঠন করেন এবং ১৯৩৩ সালের ২৮ জানুয়ারি লন্ডনে অনুষ্ঠিত তৃতীয় গোলটেবিল বৈঠকে যোগদানকারী রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের কাছে “Now Or Never : Are We to live Or Perish for ever?” শীর্ষক প্যাম্পলেট আকারে পেশ করেন। ১৯৪০ সালে মুসলিম লীগের লাহোর সম্মেলনে শেরে বাংলা একে ফজলুল হক, আল্লামা ইকবালের প্রস্তাবের সাথে সংযুক্ত করে এটিকে পাকিস্তান প্রস্তাব হিসেবে পেশ করেন এবং সর্বসম্মতিক্রমে তা পাস হয়।
১৭৫৭ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ উদ্দৌলার পরাজয়ের পর ক্রমান্বয়ে সারা ভারতভর্ষ কোম্পানি শাসনের অধীনে চলে যায়। তাদের কাছ থেকে স্বাধীনতা অর্জনের জন্য সারা উপমহাদেশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং পাশাপাশি কোম্পানির শাসনকে দৃঢ় করার জন্য ব্রিটিশ বেনিয়াদের শাসন, শোষণ, অত্যাচার-অবিচারের মাত্রা ও সীমা ছাড়িয়ে যায়। এরই প্রেক্ষাটে ১৮৫৭ সালে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন এক নতুন মোড় নেয়। লন্ডনের অদূরে অবস্থিত এনফিল্ড নামক স্থানে অবস্থিত একটি সেনানিবাস ও অস্ত্র কারখানায় একটি রাইফেল তৈরি করে সেনাবাহিনীর মধ্যে বিতরণ করা হয়। এনফিল্ড রাইফেল নামক এ অস্ত্রটিতে গুলি ভরার জন্য দাঁত দিয়ে টোটা খুলতে হতো। এ টোটায় গরু ও শুকরের চর্বি মেশানো ছিল বলে ব্যাপক প্রচারণা চলে এবং হিন্দু-মুসলিম সৈন্যদের মধ্যে প্রচণ্ড ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। হিন্দুদের জন্য গরু ও মুসলমানদের জন্য শুকর হারাম ছিল। ধারণা করা হয় যে, হিন্দু-মুসলিম উভয় ধর্মাবলম্বী সৈন্যদের ধর্ম ও জাত নষ্ট করার জন্য পরিকল্পিতভাবে ব্রিটিশরা রাইফেলের টোটায় গরু ও শুকরের চর্বি মিশিয়েছে। ফলে সেনাবাহিনীতে বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে যা সংকীর্ণ অর্থে সিপাহী বিদ্রোহ ও ব্যাপক অর্থে স্বাধীনতা সংগ্রাম নামে পরিচিতি লাভ করে। এর পরিণাম হিসেবে কোম্পানির বাহিনীতে কর্মরত হাজার হাজার সৈন্য এবং ভারতবর্ষব্যাপী লাখ লাখ স্বাধীনতাকামী বিপ্লবী হত্যা ও জুলুমের শিকার হয়। এসব শহীদের স্মরণে ঢাকার সদরঘাটে লিয়াকত এভিনিউ সংলগ্ন ভিক্টোরিয়া পার্কের সম্মুখে ষাটের দশকে ১৮৫৭ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের স্মরণে তৈরি একটি বিশাল স্মৃতিসৌধ এখনো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। আমার এত কথা বলার উদ্দেশ্য হচ্ছেÑ এটা বোঝানো যে, ভারতের স্বাধীনতা তথা ব্রিটিশদের হাত থেকে এ ভূখণ্ডটিকে স্বাধীন করে পাকিস্তান ও হিন্দুস্তানে বিভক্ত করা অত্যন্ত কঠিন কাজ ছিল। প্রায় ১৯০ বছরের কঠোর সাধনা ও সংগ্রাম এজন্য দায়ী ছিল। ব্রিটিশ বাহিনীতে কর্মরত সৈনিকদের বিদ্রোহ ছাড়াও এর পেছনে কাজ করেছে আলেম-ওলামাদের অক্লান্ত পরিশ্রম, ত্যাগ, তিতীক্ষা ও জানমালের কুরবানি। শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভির প্রতিরোধ আন্দোলন, মাওলানা সৈয়দ নিসার আলী তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা, সাইয়েদ আহমেদ বেরলবি ও শাহ ইসমাইলের শিখ ও ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রাম, মাওলানা মাহমুদ হাসানের রেশমি রুমাল আন্দোলন, হাজী শরিয়ত উল্লাহর ফরায়েজী আন্দোলন, খেলাফত আন্দোলন প্রভৃতি ছিল এর কতিপয় খণ্ডচিত্র মাত্র।
আন্দোলন ও সংগ্রামের প্রকৃতি ছিল প্রথমে শুধুমাত্র ভারতবর্ষের স্বাধীনতা, হিন্দু, মুসলমানদের জন্য আলাদা বাসভূমির প্রশ্ন ছিল না। প্রশ্ন দেখা দিল তখনÑ যখন দেখা গেল ভারতের বর্ণহিন্দু নেতৃত্ব রাষ্ট্র পরিচালনা, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুযোগ সুবিধা বণ্টনে মুসলমানদের ন্যূনতম সুবিধা দিতেও প্রস্তুত নন। কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ স্বয়ং নিজে একজন কংগ্রেস নেতা ছিলেন। হিন্দুদের দৃষ্টিভঙ্গি ও মুসমি বিদ্বেষী আচরণ তাকে ভারতীয় কংগ্রেস ত্যাগ করে মুসলিম লীগে যোগদান করতে বাধ্য করেছিল। মুসলিম লীগে যোগদান করার পরও তিনি ঐক্য প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখেন এবং হিন্দু মুসলিম ঐক্য দূতের আখ্যা পান। লণ্ডনে অনুষ্ঠিত গোলটেবিল বৈঠকে আপস ফর্মুলা হিসেবে চৌদ্দ দফা পেশ করেন, কিন্তু তা হিন্দু কংগ্রেসের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। পরিণাম হিসেবে তিনি কংগ্রেস ছেড়ে মুসলিম লীগে যোগ দিয়ে তার নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। তার নেতৃত্বে পাকিস্তানের সৃষ্টি বাংলার প্রাদেশিক নির্বাচন, সিলেট ও আসামের গণভোটে মুসলিম লীগ ও পাকিস্তানের সমর্থনে নব্বই শতাংশের বেশি রায় দেয়ায় হিন্দুদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে হলেও বাংলা ও আসাম ভাগ করে পূর্ব পাকিস্তানের সৃষ্টিও তারই দূরদর্শিতার ফল। পাকিস্তানের সৃষ্টি না হলে আজ বাংলাদেশেরও সৃষ্টি হতো না। এ হচ্ছে আমাদের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ; গত ৫৫ বছর ধরে যা থেকে আমাদের সন্তানদের অজ্ঞ বানিয়ে রাখা হয়েছে। এই ইতিহাস বর্তমান প্রজন্মের বাংলাদেশী ছেলেমেয়েরা যেমন জানে না তেমনি পাকিস্তানী ছেলেমেয়েরাও অধিকাংশ ক্ষেত্রে এ সম্পর্কে অজ্ঞ। পাকিস্তান সফরের ওপর লিখতে গিয়ে ইচ্ছা করেই আমি ভূমিকাটি একটু বড় করে ফেললাম বলে আমি দুঃখিত।
১৯৭১ সালের ৫ আগস্ট আমি তদানিন্তন পশ্চিম পাকিস্তান সফরের কথা বলেছিলাম। তখন আমার বয়স সাড়ে চব্বিশ বছর ছিল। এখন সাড়ে উনাশি বছর। ঐ সময় পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ভারতীয় ইন্ধন ও অনুপ্রেরণায় মুক্তিযুদ্ধ চলছিল এবং তার নামে সারা প্রদেশে নারকীয় পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে নিখিল পাকিস্তান ভিত্তিতে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর বিলম্বিত করার লক্ষ্যে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণার প্রেক্ষাপটে সারা প্রদেশ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। আওয়ামী লীগের জঙ্গী নেতাকর্মীরা মিছিল মিটিং, সরকারি বেসরকারি সম্পত্তির ওপর হামলা, অগ্নিসংযোগ, অবাঙ্গালী বিহারী, প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দল বিশেষ করে জামায়াত, মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলাম পার্টি প্রভৃতি দলের নেতাকর্মীদের টার্গেট করে ধ্বংসাত্মক তৎপরতা শুরু করে। এ অবস্থায় প্রশাসন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্যর্থ হওয়ায় সামরিক প্রশাসন সামরিক পদক্ষেপের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। এতে পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটে। পূর্ব পাকিস্তান পরিস্থিতি দেশ বিদেশের সংবাদপত্র ও গণমাধ্যমের শিরোনামে পরিণত হয়। এ অবস্থায় সরকার জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দাবির প্রেক্ষাপটে White Paper on the Crisis of East Pakistan শিরোনামে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করে। এ শ্বেতপত্র প্রকাশ উপলক্ষে ৫ আগস্ট ১৯৭১ সালে কেন্দ্রীয় সরকারের তথ্য সচিব জেনারেল রোয়েদাদ খান ইসলামাবাদে একটি সংবাদ সম্মেলন আহ্বান করেন। সম্মেলনে পূর্ব পাকিস্তানের দৈনিকগুলো থেকে আমরা নিম্নোক্ত সাংবাদিকবৃন্দ অংশগ্রহণ করি: ১. ডেইলি মর্নিং নিউজ সম্পাদক জনাব বদরুদ্দীন, ২. ডেইলি পাকিস্তান অবজার্ভার, দৈনিক পূর্ব দেশ ও রোজনামা ওয়াতন থেকে সহকারী সম্পাদক হিসেবে আমি স্বয়ং মো. নূরুল আমিন, ৩. দৈনিক ইত্তেফাক থেকে সম্পাদক ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেন, ৪. দৈনিক আজাদ থেকে সম্পাদক জনাব মুজিবর রহমান খান, ৫. দৈনিক পাকিস্তান থেকে ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক জনাব কবি সামছুর রহমান, ৬. দৈনিক সংগ্রাম থেকে সম্পাদক অধ্যাপক মাওলানা আখতার ফারুক, ৭. দৈনিক আজাদী (চট্টগ্রাম) থেকে দু’জন, যথাক্রমে- সম্পাদক মোহাম্মদ খালেদ ও ৮. নির্বাহী সম্পাদক জনাব আবদুল মালেক।
আট সদস্যের প্রতিনিধি দলের মধ্যে আমি ছিলাম সর্বকনিষ্ঠ। এদের দু’জন, ইত্তেফাকের ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেন ও চট্টগ্রামের দৈনিক আজাদীর মোহাম্মদ খালেদ ১৯৭০ সালে আওয়ামী লীগের টিকিটে নির্বাচিত জাতীয় পরিষদ সদস্য (এমএনএ) ছিলেন। প্রতিনিধি দলের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেন আমাদের দলনেতার দায়িত্ব পালন করেন। প্রকাশনা অনুষ্ঠান শেষে রাওয়াল পিণ্ডি হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আয়োজিত উন্মুক্ত অধিবেশনে পূর্ব পাকিস্তানী সাংবাদিক প্রতিনিধি দলের একটি মাত্র ঐক্যবদ্ধ দাবি ছিল, সেটা ছিল : “Mr General Raedad, we want a Political solution to the problem of East pakistan, we reiterate, a political Solution within the frame work of united Pakistan.” (মি. জেনারেল রোয়েদাদ, আমরা পূর্ব পাকিস্তান সমস্যার একটা রাজনৈতিক সমাধান চাই, আবার বলছি, আমরা ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তানের কাঠামোর ভিতর একটি রাজনৈতিক সমাধান চাই)। দুর্ভাগ্যবশত দু’টি কারণে দেশটি এক থাকতে পারেনি। প্রথমত সামরিক জান্তারা রাজনৈতিক সমস্যার সামরিক সমাধানকে প্রাধান্য দিয়েছেন। দ্বিতীয়ত তারা পাকিস্তানের (এবং বর্তমান বাংলাদেশেরও) চির দুশমন ব্রাহ্মণ্যবাদী ভারতের কুটচাল ও শক্তিকে খাটো করে দেখেছিলেন। পাকস্তিান শুধু একটি দেশের নাম নয়, একটি স্বপ্ন, উচ্ছ্বাস ও আবেগের নাম ছিল। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান হবার পর বাংলার হাজারো স্থানে পাকিস্তান বাজার নামে গ্রাম্য হাট প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আমার বাড়ির পূর্ব পাশে গজারিয়া বাজার নামে একটি হাট আছে। এর পূর্ব নাম ছিল পাকিস্তান বাজার। নোয়াখালীর কোম্পানিগঞ্জের বামনী হাই স্কুলে আমি কিছুকাল পড়েছিলাম। ঐ স্কুলে মোহাম্মদ ইদ্রিস নামে একজন দফতরী ছিল। ১৪ আগস্ট যেদিন পাকিস্তান হয় সে দিন তিনি আনন্দে এতই আত্মহারা হয়ে গিয়েছিলেন যে, পাকিস্তান পাকিস্তান স্লোগান দিতে দিতে তিনি সারাদিন নেচেছিলেন। এলাকাবাসী তার নাম দিয়েছিল পাকিস্তান। ইদ্রিস যতদিন বেঁচে ছিলেন পাকিস্তান নামেই বেঁচে ছিলেন।
এখন সফর প্রশ্নে আসি। আমার এবারের সফরটির অনুপ্রেরণা ছিল দু’টি। এক. গত ৫৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে দেশি বিদেশি পত্রপত্রিকায় অব্যাহতভাবে পাকিস্তান বিরোধী প্রচারণা। এর সাথে বিশ্বব্যাপী ইসলামী আন্দোলন জামায়াত বিরোধী প্রচারণাও। পাকিস্তানের অর্থ সন্ত্রাস-নৈরাজ্য আর জামায়াত-শিবির হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ায় ফেইথ-বেইজড জঙ্গী একটি ইসলামী আন্দোলন ও দল যা তাদের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নাইন ইলেভেনের পর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সন্ত্রাস বিরোধী যাবতীয় কর্মকাণ্ডকে ব্যর্থ করে দিচ্ছে। কাজেই টিকে থাকার তাদের কোনও অধিকার নেই। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক সিটির ইউএন প্লাজা হোটেলে কয়েক বছর আগে অনুষ্ঠিত “Terrorism, Democracy and Economic Development in Bangladesh” শীর্ষক একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে একজন বৃটিশ রাজনৈতিক গোয়েন্দা বিশ্লেষক ক্রিস ব্ল্যাকবার্ন, Jamaat-e-Islami : A Threat to Bangladesh শিরোনামে একটি প্রবন্ধ পাঠ করেছিলেন। এই প্রবন্ধে তিনি বাংলাদেশ জামায়াতের সাথে পাকিস্তানের সংশ্লিষ্টতা থাকার অভিযোগ করে পাকিস্তানের আইএসআই-এর মাধ্যমে দলটি অর্থ পাচারে জড়িত রয়েছে বলে হাওয়াই অভিযোগ তোলেন এবং দলটি শরিয়া ভিত্তিক ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথে অনেক দূর এগিয়ে গেছে বলে জানান।
আমি কৃতজ্ঞ যে, করাচীর দৈনিক জাসারাতের বন্ধুবর সৈয়দ তাহের আকবর এবং ইসলামাবাদের খ্যাতনামা বেসরকারি সংস্থা আর রাহমার প্রেসিডেন্ট ও আজাদ জন্মু ও কাশ্মীর জামায়াতের নায়েবে আমীর বিশিষ্ট লেখক ও সাংবাদিক জনাব সগীর কমর আমাকে পাকিস্তান সফরে উদ্বুদ্ধ করেছেন, আমার ভিসা স্পন্সর করেছেন এবং সামগ্রিকভাবে আমার সফরসূচী প্রণয়ন, বাস্তবায়ন ও সমন্বয় করেছেন এবং সফরকে সাফল্যমণ্ডিত করার জন্য সার্বক্ষণিক সহযোগিতা করেছেন। আগেই বলেছি, ৯ জুলাই বৃস্পতিবার বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইটে মধ্যরাতে আমরা করাচির কায়েদে আজম আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে পৌঁছাই। করাচীর জাসারত পত্রিকার সাংবাদিক ও করাচী প্রেস ক্লাবের আমার প্রিয় সহকর্মীরা আগে থেকেই ফুলের তোড়া নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে আমাদের অভ্যর্থনা জানানোর জন্য অপেক্ষা করছিলেন। তারা গাড়িযোগে আমাদের করাচীর একটি অভিজাত এলাকা গুলশানে জামালে গ্যালাক্সি ইন্ নামক একটি গেস্ট হাউজে নিয়ে যান। সুন্দর মনোরম পরিবেশের এ গেস্ট হাউজটি বেশ আকর্ষণীয়। পরদিন শুক্রবার বিশ্রাম ও নাস্তা শেষে করাচীর বিখ্যাত নিউ মেমন মসজিদে জুমা পড়তে যাই। ২৭০০০ বর্গফুটের এই মসজিদটি ১৯৪৯ সালে ঢাকার নবাববাড়ির সন্তান খাজা নাজিমুদ্দিন পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল থাকাকালে উদ্বোধন করেন। নামায শেষে আমরা করাচীর একটি বিখ্যাত এনজিও ঈদি ফাউণ্ডেশনের অফিসে যাই। এনজিওটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন বিশিষ্ট দানবীর জনাব আবদুস সাত্তার ঈদি। দারিদ্র্যবিমোচন, নারী ও শিশু উন্নয়ন, স্বাস্থ্য সেবা, খাবার ও গৃহস্থালী কাজে পানি সরবরাহের ব্যবস্থা, বিনামূল্যে এম্বুলেন্স সেবা এবং প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট দুর্যোগে ত্রাণ তৎপরতা প্রভৃতি হচ্ছে ফাউণ্ডেশনটির কাজ। জনাব আবদুস সাত্তার ঈদি মৃত্যুবরণ করেছেন। তার অবর্তমানে তার স্ত্রী বিলকিস বেগম ও ছেলে তার সূচিত সেবা তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন। দুপুরের লাঞ্চ শেষে করাচী বীচ এলাকার মনোমুগ্ধকর দৃশ্যাবলী উপভোগ করি এবং রাতে বীচ রেস্তোরাঁয় ডিনার সম্পন্ন করি। পরদিন শনিবার পূর্বাহ্ণে করাচী প্রেস ক্লাবে আয়োজিত অলপাকিস্তান নিউজ পেপার মালিক সমিতির সভাপতি সিনেটার সামসাদ আলী প্রদত্ত ভোজসভায় অংশগ্রহণ করি। (চলবে)