জসিম উদ্দিন মনছুরি

বাংলাদেশের তৎকালীন স্বৈরাচারী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে ভারতের অবস্থান স্পষ্ট করা হয়েছে। ভারতীয় পার্লামেন্টে উত্থাপিত একটি প্রশ্নের জবাবে জানানো হয় শেখ হাসিনাকে ভারতের অভ্যন্তরে অবস্থান করে অন্য দেশের (বাংলাদেশের) বিরুদ্ধে রাজনীতির সুযোগ দেওয়া হয়নি এবং দেওয়া হবেও না। সাম্প্রতিক সময়ে শেখ হাসিনার বেশ কয়েকটি অডিও ভিডিও কল ফাঁস হওয়ার পর এই সিদ্ধান্ত আসলো। ইতোমধ্যে ভারতের রাজনীতিতে ককরোচ আন্দোলন নতুন ঝড়ের সৃষ্টি করেছে। ভারত সরকারের সীমাহীন দুর্নীতি, দমননীতি ও প্রশ্নপত্র ফাঁসসহ বিভিন্ন ইস্যুতে ককরোচ আন্দোলন দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়লে মোদি সরকারের অবস্থা নড়বড়ে হয়ে পড়ে। অল্পের জন্য ক্ষমতা থেকে বেঁচে যাওয়া নরেন্দ্র মোদি আন্দোলনকারীদের সাথে সমঝোতা করে অবশেষে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে আন্দোলনের সমাপ্তি হয়। এর মাঝে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কর্মকান্ড নিয়ে প্রশ্ন উঠলে ভারতীয় সংসদ থেকে জানানো হয় শেখ হাসিনাকে ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে অন্য দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র কিংবা নৈরাজ্য সৃষ্টির সুযোগ দেওয়া হবে না। উল্লেখ্য যে শেখ হাসিনা সরকার ৫আগস্ট ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে পতন হয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গকে নিয়ে শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যায়। শেখ হাসিনার স্বৈরাশাসন শুরু হয় ৬ জানুয়ারি ২০০৯ থেকে ৫ আগস্ট ২০২৪ পর্যন্ত। স্থায়ীত্ব: একটানা প্রায় ১৫ বছর ৭ মাস।

শেখ হাসিনার শাসনামলে বিরোধীদের দমনপীড়ন, বাকস্বাধীনতা হরণ সীমাহীন দুর্নীতি, আত্মীয়করণ, দলীয়করণসহ তার বিরুদ্ধে অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে। তিনি এতটাই আগ্রাসী হয়ে উঠেছিলেন তার বিরুদ্ধে কেউ সামাজিক মাধ্যম কিংবা প্রকাশ্যে কথা বলার সুযোগ ছিল না। সামাজিক মাধ্যমে তার বিরুদ্ধে কোন কমেন্ট কিংবা লাইক দিলেও তার রক্ষা ছিল না। তার বিরুদ্ধে হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচারসহ দুর্নীতির এমন কোন দিক ছিল না যা তিনি করেননি। তার সরকারের প্রতিটি মন্ত্রী, এমপি এবং কর্মীরা পর্যন্ত কোটি কোটি টাকার সম্পদের মালিকে পরিণত হয়। তার গাড়ি চালকেরও ছিল ৪০০ কোটি টাকা সমমূল্যের সম্পদ। তার আবিষ্কৃত নতুন ধারণা আয়নাঘর। গুম করে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের শাস্তি দেওয়া হতো এই আয়নাঘরে। গণঅভ্যুত্থানে তার পতন হলে আয়নাঘর থেকে উদ্ধার করা হয় মীর কাসেম আলীর পুত্র ব্যারিস্টার আরমান এবং মরহুম অধ্যাপক গোলাম আজমের পুত্র আব্দুল্লাহিল আমান আজমির মত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গকে। তাছাড়া তার সরকারের আমলে গুম হয়েছিল ইলিয়াছ আলীর মত প্রভাবশালী বিএনপি নেতা। সরকারের কার্যকাল স্থায়ী করতে তিনি জামায়াতে ইসলামীর গুরুত্বপূর্ণ নেতৃবৃন্দকে কথিত যুদ্ধ অপরাধের অভিযোগে একের পর এক ফাঁসি দেন। অবশেষে জুলাইয়ের ৩৬ দিনব্যাপী আন্দোলনে ১৪০০জন শাহাদাত এবং অসংখ্য পঙ্গুত্ববরণের মাধ্যমে শেখ হাসিনা সরকারের পতন হয়।

বিচারপতি গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চ এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান চলাকালীন সংঘটিত গণহত্যামূলক অপরাধ ও দমন-পীড়নের দায়ে তাকে এই দণ্ড দেওয়া হয়।

প্রতিবেশী রাষ্ট্রটির সাথে বাংলাদেশের মোট সীমান্ত সংযোগের দৈর্ঘ্য প্রায় ৪,১৫৬ কিলোমিটার (প্রাতিষ্ঠানিক বা সরকারি হিসেবে ৪,০৯৬.৭০ কিলোমিটার)। এটি বিশ্বের পঞ্চম দীর্ঘতম স্থল সীমান্ত। সীমান্ত সম্পর্কিত তথ্যে জানা যায় , ভারতের রাজ্যভিত্তিক সীমান্ত: পশ্চিমবঙ্গ (২,২১৬.৭ কিমি), আসাম (২৬৩ কিমি), মেঘালয় (৪৪৩ কিমি), ত্রিপুরা (৮৫৬ কিমি) এবং মিজোরাম (৩১৮ কিমি)।অন্যান্য সীমান্ত: ভারতের পাশাপাশি বাংলাদেশের সাথে মিয়ানমারের মাত্র ২৭১ কিলোমিটার সীমান্ত।

ভারতের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশ। পিয়াজ, চালসহ বিভিন্ন সামগ্রী বাংলাদেশে রপ্তানি করে থাকেন। ভারত ও বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক টানা পোড়েনের মাঝে বাংলাদেশের বাজারটি প্রায় হারাতে বসেছিল ভারত সরকার। এর মাঝে বাংলাদেশীরা চিকিৎসার জন্য কলকাতাসহ বিভিন্ন প্রদেশে যাতায়াত করে থাকেন কিন্তু সম্পর্কের টানা পোড়েনের মাঝে বাংলাদেশীরা কলকাতা সহ বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে না যাওয়ায় তাদের মধ্যে মারাত্মক অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিয়েছে। এছাড়া ভারতের পিয়াজ ও আলু চাষীদের মধ্যেও তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। অনেক কৃষককে আলু ও পিয়াজ পুড়িয়ে ফেলতে দেখা গেছে। এর মাঝে ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলনে দিশেহারা হয়ে পড়ে বিজেপি সরকার। আভ্যন্তরীণ সংকটে দিশেহারা মোদি সরকারের হয়তো এবার শুভবুদ্ধির উদয় হয়ে শেখ হাসিনাকে ফেরত দিতে সম্মত হবে কিনা দেখার বিষয়। অবস্থা যাই হোক না কেন ভারত সরকারের শুভবুদ্ধির উদয় হয়ে প্রতিবেশী দেশের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়াই একমাত্র সম্পর্ক উন্নয়নের প্রাথমিক ধাপ বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা। আশা করি ভারত সরকার শেখ হাসিনার মতো ভয়ংকর খুনি ও স্বৈরাশাসককে বাংলাদেশে প্রত্যার্পণ করবে বলে আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস। শেখ হাসিনাকে দেশে এনে ১৫০০ জন শহীদের হত্যাকাণ্ডের বিচারসহ তার সময়ে সংগঠিত অসংখ্য হত্যা, গুম, নৈরাজ্য এবং বিডিআর হত্যাকাণ্ড, শাপলা হত্যাকাণ্ডের মত গুরুত্বপূর্ণ হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবে বলে দৃঢ় বিশ্বাস। আশা করি ভারত সরকারের সাথে যোগাযোগ অক্ষুণ্ন রেখে বাংলাদেশ সরকার স্বৈরাচারী হাসিনাকে দেশে এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মুখোমুখি করবে।

লেখক : কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক