• ৯৯ শতাংশ ভবনই অনুমোদিত নকশাবহির্ভূত
  • রাজউকের নকশা এখন শুধুই আনুষ্ঠানিকতা
  • ইউটিলিটি সংযোগের আড়ালে বাড়ছে অগ্নিঝুঁকি
  • আবাসিক অনুমোদনের আড়ালে রেস্তোরাঁ ও গুদামের রাজত্ব

রাজধানী ঢাকা এখন এক আকাশচুম্বী আতঙ্কের শহর। বাইরে থেকে ফিটফাট ও আধুনিক মনে হলেও, ভেতরের চিত্রটা একেবারেই আলাদা। রাজধানীর অন্তত ৭৪ শতাংশ ভবনই নির্মিত হয়েছে অনুমোদিত নকশা অমান্য করে। আর যদি রাজউকের আইন শাখার তথ্য মিলিয়ে দেখি, তবে শিউরে উঠতে হয়; তাদের মতে রাজধানীর ৯৯ শতাংশ ভবনই অনুমোদিত নকশা বহির্ভূত। কাগজে-কলমে যে ভবনটি শতভাগ নিরাপদ হিসেবে সনদ পাচ্ছে, বাস্তবে সেই ভবনটিই দাঁড়িয়ে আছে মরণফাঁদ হয়ে। সরকারি সংস্থাগুলোর অনুমোদন নিয়ে অজ¯্র মরণফাঁদ নির্মাণের পর এসব ভবনে বাস করছে লাখ লাখ মানুষ। ব্যবস্থাপনায় বিশাল ফাঁকফোকর আর তদারকির অভাবে রাজধানীতে এই সঙ্কট স্থায়ী হয়ে আছে।

বেইলি রোডের গ্রিন কোজি কটেজে ৪৬টি প্রাণের আহাজারি কিংবা মহাখালীর খাজা টাওয়ারের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন সেই ভয়াবহ স্মৃতিগুলো আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছিল, ঢাকার অধিকাংশ ভবন আসলে কাগজে-কলমে নিরাপদ, কিন্তু বাস্তবে একেকটি জীবন্ত বারুদের স্তূপ। কিন্তু পরিস্থিতির কোনো হেরফের হয়নি বরং জটিলতা বেড়েছে। নকশা অনুমোদনের সময় রাজউক আর ফায়ার সার্ভিসকে যে নিখুঁত অগ্নিনিরাপত্তা মানচিত্র দেখানো হয়, ভবন নির্মাণের শেষ পর্যায়ে এসে তার ছিটেফোঁটাও অবশিষ্ট থাকে না। একটি নিরাপদ নকশা কেবল ব্যবসায়িক মুনাফার লোভে মরণফাঁদে রূপান্তরিত হয়। এ ধরনের ধোঁকা কেবল প্রশাসনিক অবহেলা নয়, বরং একেকটি ‘কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড’। গবেষণা অনুযায়ী, আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, সাত মাত্রার ভূমিকম্প হলে ঢাকার ৭২ হাজার ভবন ধসে পড়তে পারে।

ভবন নির্মাণের প্রথম ধাপ রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) থেকে নকশা অনুমোদনের প্রক্রিয়াটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়েছে। মালিকপক্ষ বা ডেভেলপার কোম্পানিগুলো অনুমোদনের জন্য যে নকশা জমা দেয়, নির্মাণের সময় তার খুব সামান্যই বজায় থাকে। ভবনের চারপাশে যে পরিমাণ জায়গা ফাঁকা রাখার কথা, তা রাখা হচ্ছে না। নকশায় হয়তো পাঁচ তলার অনুমোদন নেয়া হয়েছে, কিন্তু বাস্তবে দাঁড়িয়ে আছে সাত বা আটতলা ভবন। এমনকি কার পার্কিংয়ের জন্য নির্ধারিত বেসমেন্ট বা নিচতলাকে ব্যবহার করা হচ্ছে বাণিজ্যিক গোডাউন বা দোকান হিসেবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজউকের মাঠ পর্যায়ের পরিদর্শকদের অবহেলা এবং অনেক ক্ষেত্রে ‘গোপন সমঝোতার’ কারণে এই বিচ্যুতিগুলো প্রতিরোধ করা যাচ্ছে না। অথচ রাজউকের নতুন অধ্যাদেশ ২০২৬ অনুযায়ী, নকশাবহির্ভূত ভবন নির্মাণ করলে দুই বছরের কারাদণ্ড ও ৫০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে।

ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ২০০৮ অনুযায়ী, ভবন নির্মাণ শেষ হওয়ার পর সেটি ব্যবহারের জন্য রাজউক থেকে ‘অকুপেন্সি সার্টিফিকেট’ বা ব্যবহার সনদ নেয়া বাধ্যতামূলক। এই সনদটির মাধ্যমেই নিশ্চিত হওয়া যায় যে, ভবনটি অনুমোদিত নকশা ও অগ্নিনিরাপত্তা বিধি মেনে তৈরি হয়েছে। কিন্তু ঢাকার অধিকাংশ ভবন মালিক এই সনদের জন্য আবেদনই করেন না।

আইন অনুযায়ী, অকুপেন্সি সার্টিফিকেট ছাড়া কোনো সেবাদানকারী সংস্থা ইউটিলিটি সেবা তথা গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ দিতে পারবে না। কিন্তু বাস্তবে এই নিয়ম যাচাইয়ের কোনো চল নেই। ভবন মালিকরা রাজনৈতিক প্রভাব বা কর্মকর্তাদের ‘খুশি’ রেখে এই সংযোগগুলো অনায়াসেই পেয়ে যাচ্ছেন। ফলে ভবনটি ব্যবহারের উপযোগী কি না বা নিরাপদ কি না, তা নিশ্চিত না করেই গ্যাস ও বিদ্যুৎসংযোগের মতো ঝুঁকিপূর্ণ সেবাগুলো প্রদান করা হচ্ছে, যা যেকোনো সময় বড় অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।

২০২০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বিগত চার বছরের উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ঢাকার ভবন মালিকরা ভবন নির্মাণের শুরুতে ‘অগ্নিনিরাপত্তা ছাড়পত্র’ নিতে যতটা তৎপর, ভবন নির্মাণ শেষে সেই নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করে ‘কার্যকারিতা সনদ’ নিতে ততটাই অনাগ্রহী। ফায়ার সার্ভিসের তথ্য মতে, গত চার বছরে ছয় হাজার ২৮৪টি ভবন ছাড়পত্র নিলেও মাত্র ৪৮৪টি ভবন শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত সনদ পেয়েছে। অর্থাৎ প্রায় ৯২ শতাংশ ভবনই আইনত ব্যবহারের অনুপযোগী এবং চরম অগ্নিঝুঁকিপূর্ণ।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, একটি ভবন যখন নকশা অনুমোদনের জন্য ফায়ার সার্ভিসের ‘চেক লিস্ট’ জমা দেয়, তখন সেখানে দুই দশমিক পাঁচ ইঞ্চি ডায়ামিটারের ফায়ার ব্রিগেড কানেকশন, অটোমেটিক স্প্রিঙ্কলার সিস্টেম, স্মোক ডিটেক্টর এবং ফায়ার লিফটের মতো আধুনিক সব সরঞ্জামের উল্লেখ থাকে। কিন্তু বাস্তবে যখন নির্মাণ শেষ হয়, দেখা যায় মুনাফার লোভে সিঁড়ির প্রশস্ততা কমিয়ে ফেলা হয়েছে কিংবা রিফিউজ এরিয়াকে গুদামে রূপান্তর করা হয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ভবন মালিকরা জানেন অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী ভবন নির্মাণ না করায় তারা সনদ পাবেন না। স্প্রিঙ্কলার সিস্টেম বা ফায়ার রেটেড ওয়াল তৈরিতে যে বিশাল খরচ, তা তারা পকেটে ভরেন। তিতাস, ডেসকো বা ওয়াসা-অকুপেন্সি সার্টিফিকেট ছাড়াই অর্থের বিনিময়ে বা প্রভাবের কারণে সংযোগ দিয়ে দেয়। ঢাকার দুই হাজার ৬০৩টি ভবন বর্তমানে চরম অগ্নিঝুঁকিতে রয়েছে, যার মধ্যে এক হাজার ১০৬টিই বিপণিবিতান।

ফায়ার সার্ভিস সূত্র মতে, বর্তমানে ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে অগ্নি নিরাপত্তা বিষয়ক ছাড়পত্র নেয়ার প্রবণতা আগের তুলনায় বেড়েছে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ অফিস এখন ফায়ার সার্ভিসের এনওসি বা অনাপত্তিপত্র ছাড়া নতুন সংযোগ দিচ্ছে না, যার ফলে ভবন মালিকরা এই ছাড়পত্র নিতে বাধ্য হচ্ছেন। তবে ফায়ার সার্ভিস মূলত স্ট্রাকচারাল ডিজাইনের ওপর ভিত্তি করে অগ্নিনিরাপত্তা ডিজাইন ঠিক আছে কি না, সেই সম্পর্কিত ছাড়পত্র দিয়ে থাকে; ভবনটি নিয়ম মেনে তৈরি হচ্ছে কি না তা তদারকি করার মূল কর্তৃপক্ষ হলো সিটি করপোরেশন বা রাজউক।

বাংলাদেশে ২০০৩ সাল থেকে ‘অগ্নি প্রতিরোধ ও নির্বাপণ আইন’ কার্যকর হয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড ২০০৬ সালে আসার আগের ভবনগুলোর অধিকাংশেরই অগ্নিনিরাপত্তা ছাড়পত্র নেই। বর্তমানে সারা দেশে ২৬৮ জন পরিদর্শক রয়েছেন যারা হাইরাইজ ভবন এবং ফ্যাক্টরিগুলো নিয়মিত পরিদর্শন করেন এবং ফায়ার সেফটি প্ল্যানের আওতায় আসার জন্য নোটিশ দেন।

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো: রিয়াজুল ইসলাম বলেন, ভূমিকম্পে ভবন ধসে পড়ার প্রধান কারণ শুধু ভবনের উচ্চতা নয়, বরং ত্রুটিপূর্ণ নকশা, মাটির অবস্থা ও নির্মাণে অনিয়ম। তাই ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে অনুমোদিত নকশা, মাটি পরীক্ষা এবং প্রকৌশলগত মান নিশ্চিত করা জরুরি। অনুমোদিত ছয়তলা ভবনকে নিয়মবহির্ভূতভাবে ১০ তলা করা কিংবা নকশা পরিবর্তন করে নির্মাণের সুযোগ দেয়া হবে না। এ ধরনের ভবনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কারিগরি ও আইনি যাচাই ছাড়া অনুমোদন দেয়ার কোনো সুযোগ নেই।

বুয়েটের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মুসলেহ উদ্দিন হাসান বলেন, রাজধানীতে বর্তমানে ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে অনুমোদিত নকশা এবং বাস্তবায়নের মধ্যে যে বিশাল পার্থক্য দেখা দিচ্ছে, তা ভূমিকম্প বা অগ্নিকাণ্ডের মতো দুর্যোগে মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে। ভবন নির্মাণের এই অনিয়ম এবং সফলতার দায়ভার প্রধানত রাজউক কর্তৃপক্ষকেই নিতে হবে। বর্তমানে রাজউক অনেক সময় ছোট ছোট অনিয়মকারীদের পেছনে সময় ব্যয় করে, কিন্তু যারা বড় ধরনের আইন লঙ্ঘন করছেন, তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছেন। কেউ যদি জনসাধারণের রাস্তা বা জায়গা দখল করে ভবন নির্মাণ করেন, তবে সেখানে কোনো ছাড় দেয়ার সুযোগ নেই; সেটি অবশ্যই ভাঙতে হবে।

তিনি আরো বলেন, সার্বিক তদারকি জোরদার করতে রাজউক এককভাবে কাজ না করে থার্ড পার্টি হিসেবে পেশাদার পরিকল্পনাবিদ, স্থপতি বা প্রকৌশল সংস্থাগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করতে পারে। এ ছাড়া আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে যেমন- স্যাটেলাইট ইমেজ বা রিমোট সেন্সিং টেকনোলজি ব্যবহার করে খুব সহজেই কোন ভবনটি নকশা বহির্ভূতভাবে তৈরি হচ্ছে তা শনাক্ত করা সম্ভব । ফায়ার সার্ভিস ৬ তলার উপরের ভবনকে হাইরাইজ হিসেবে গণ্য করলেও রাজউক ১০ তলার ওপর থেকে তা বিবেচনা করে। এই সংজ্ঞাগত পার্থক্যের কারণে অনেক সাত থেকে আট তলা ভবনেও লিফট বা পর্যাপ্ত অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা রাখা হয় না, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।