দেশে অনলাইন জুয়া এখন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে বলে মনে হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রীতিমত হিমসিম খাচ্ছে। এতে একশ্রেণির জুয়াড়িরা কোটিপতি হচ্ছেন। অপরদিকে সর্বস্বান্ত হচ্ছে সরলমনা সাধারণ মানুষ। মূলত, অনলাইন জুয়া (এটি iGaming বা iGambling নামেও পরিচিত) হলো ইন্টারনেটে পরিচালিত যেকোনো ধরনের জুয়া। এর মধ্যে রয়েছে ভার্চুয়াল জুজু, ক্যাসিনো এবং স্পোর্টস বেটিং। এটি সম্পূর্ণ বেআইনি হলেও দেশে চলছে এর রমরমা ব্যবসা।

ফলে অনলাইন জুয়ার প্রলোভনে প্রতিদিনই নিঃস্ব হচ্ছেন হাজারো সাধারণ মানুষ। ২ থেকে ১০ গুণ লাভের লোভ দেখিয়ে বিভিন্ন ওয়েবসাইটে বিনিয়োগে উৎসাহিত করছে সংঘবদ্ধ চক্র। লেনদেনে ব্যবহার হচ্ছে বিকাশ, নগদ, রকেটসহ মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস)। শুরুতে কিছু লাভ দেখিয়ে পরে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে তা ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে বিদেশে পাচার করা হচ্ছে। কিন্তু অপরাধীরা থাকছে একেবারে ধরাছোঁয়ার বাইরে।

সম্প্রতি এ অপরাধী চক্রের দু’সদস্য গ্রেপ্তারের পর ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) জানতে পেরেছে, চক্রের মূলহোতারা দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। সুজন নামে একজন নেপালে এবং আকাশ নামে আরেকজন দুবাইয়ে রয়েছেন বলে তথ্য মিলেছে। আরেক হোতা শীতলের অবস্থান এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। একই কৌশলে বিভিন্ন নামে একাধিক বেটিং সাইট পরিচালনা করছে এসব চক্র।

সাইবার প্যাট্রলিংয়ের মাধ্যমে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ৩ শতাধিক এমএফএস এজেন্ট নম্বর শনাক্ত করে, যেগুলোর মাধ্যমে জুয়ার কোটি কোটি টাকার লেনদেন হচ্ছিল। এ ঘটনায় মামলা ও কয়েকজন এজেন্ট গ্রেপ্তার হলেও বিদেশ থেকে সাইট পরিচালিত হওয়ায় তদন্তে আশ্বস্ত হওয়ার মত কোনো অগ্রগতি নেই। ফলে সমস্যা যে তিমিরে ছিল সে তিমিরেই রয়ে গেছে। ফলে পুরো দেশই এখন অনলাইন জুয়াড়িদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, দেশে শত শত চক্র একই পদ্ধতিতে অনলাইন জুয়ার বিস্তৃত নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। কৃষক, দিনমজুর, ভ্যানচালক থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ আন্তর্জাতিক বেটিং সাইটে জড়িয়ে পড়ছেন এবং সর্বস্ব হারিয়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছে। মেলবেট, মোস্টবেট, ওয়ানএক্সবেট, বেটউইনার, টুয়েন্টিটুবেটসহ বিভিন্ন সাইটের মাধ্যমে প্রতিদিন বিপুল অঙ্কের অর্থ বিদেশে পাচার হচ্ছে। ডিবি ও সিআইডির তথ্যানুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় ৭শ’ থেকে ৮শ’ কোটি টাকা ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। গোয়েন্দাদের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, আইটি বিষয়ে দক্ষ অনেক তরুণ সাব-এজেন্ট হিসেবে যুক্ত হচ্ছেন। বিশেষ করে কম্পিউটার সায়েন্সের ঝরে পড়া শিক্ষার্থী কিংবা আইটি প্রশিক্ষণ নিয়ে কর্মসংস্থানে ব্যর্থ অনেকেই এ অপরাধ চক্রে জড়িয়ে পড়ছেন।

এ বিষয়ে ডিবির সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড সাপোর্ট সেন্টার সূত্র জানাচ্ছে, বিভিন্ন কারণে অনলাইন জুয়া ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। অভিযোগ পেলেই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে ভুক্তভোগীরা অনেক সময় আইনি পদক্ষেপ নিতে আগ্রহী হন না। তারপরও গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এসব কথায় সাধারণ মানুষ কোনোভাবেই আশ্বস্ত হতে পারছেন না।

মূলত, অনলাইন জুয়ার পুরো নেটওয়ার্ক পরিচালিত হয় মাস্টার, সুপার ও সাব-এজেন্টের মাধ্যমে। আর্থিক লেনদেনে ব্যবহৃত হয় এমএফএস এজেন্টরা। এ চেইনের সদস্যরা একে অপরকে সরাসরি চেনেন না। কমিশনভিত্তিক এ ব্যবস্থায় মাস্টার এজেন্টরা বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিয়ে পুলিশের নজর এড়াতে দুবাই বা নেপালে চলে যান। ডিবির সাইবার সেন্টারের তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে পরিচালিত অধিকাংশ বেটিং সাইটের সার্ভার রাশিয়া, সাইপ্রাস ও চীনে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ও মালয়েশিয়া থেকেও কিছু সাইট পরিচালিত হয়। বাংলাদেশে কার্যক্রম বন্ধে একাধিকবার চিঠি পাঠানো হলেও সাড়া মেলেনি। বিদেশী, বিশেষ করে চীনা নাগরিকদের একটি অংশও এসব কার্যক্রমে জড়িত। সম্প্রতি কয়েকজন চীনা নাগরিক গ্রেপ্তার হয়েছেন। চট্টগ্রামভিত্তিক আরও একটি চক্রের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে। কিন্তু এ বিষয়ে তেমন কোনো অগ্রগতির খবর এখনো পাওয়া যায়নি। গোয়েন্দা সূত্র জানাচ্ছে, প্রথমে সাব-এজেন্ট হিসেবে কাজ করে বিশ্বস্ততা অর্জনের পর অর্থের বিনিময়ে সাইট পরিচালনার সুযোগ পাওয়া যায়। এরপর নিজের নামে নতুন ব্র্যান্ড তৈরি করে আরও এজেন্ট নিয়োগ দেওয়া হয়। আর্থিক লেনদেন সমন্বয় করা হয় টেলিগ্রাম অ্যাপের মাধ্যমে। আর এভাবেই অবলীলায় চলে এদের অনলাইন জুয়ার অবৈধ ব্যবসা।

গত বছর সাইবার পেট্রোলিংয়ে অস্বাভাবিক লেনদেনের সূত্র ধরে ১২ জনকে শনাক্ত করে সিটিটিসি। তাদের বেশিরভাগই বর্তমানে দুবাই থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। সম্প্রতি ডিবি আরও ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে। তাদের একজনের দৈনিক ব্যয়ই ছিল লাখ টাকার বেশি। বিপরীতে তাদের ফাঁদে পড়ে সর্বস্ব হারাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। এ বিষয়ে অপরাধ বিশেষজ্ঞদের অভিমত হলো, প্রলোভন, দুর্বল আইন প্রয়োগ ও শাস্তির অভাবের কারণে অনলাইন জুয়া দ্রুত বিস্তার লাভ করছে। জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা না নিলে এ প্রবণতা কমবে না। প্রয়োজনে এ অপরাধ দমনের জন্য শূন্য সহনশীলতাসহ নতুন আইন প্রণয়ন ও যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

অনলাইন জুয়ার কার্যক্রম নিকট অতীতেই সীমিত পরিসরে থাকলেও এখন তা ব্যাপকভাবে বিস্তৃতি লাভ করেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উদাসীনতা, আইনের দুর্বল প্রয়োগ ও সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহিতার অভাবেই সার্বিক পরিস্থিতির বড় ধরনের অবনতি হয়েছে। এমতাবস্থায় এ সর্বনাশা জুয়ার লাগাম টেনে ধরা না গেলে আগামী দিনে পরিস্থিতির আরো অবনতি হবে। তাই এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কঠোর ও আইনানুগ পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার।