চলতি বছরের মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলে গত ১৯ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় বিপর্যয় দেখা গেছে। এবার গড় পাসের হার নেমে এসেছে ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশে, যা ২০০৭ সালের পর সর্বনিম্ন। এ ছাড়া গত বছরের তুলনায় পাসের হার কমেছে ৬ দশমিক ২০ শতাংশ। একইসাথে কমেছে জিপিএ ৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও। এবার জিপিএ ৫ পেয়েছে মোট এক লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জন।
গতকাল সকালে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশের প্রক্রিয়া উদ্বোধন করেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। এ সময় সব শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানরা শিক্ষামন্ত্রীর কাছে পরীক্ষার ফল হস্তান্তর করেন। এরপর বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সৈয়দ আক্তারুজ্জামান ফলাফলের বিস্তারিত পরিসংখ্যান তুলে ধরেন।
এ বছর দেশের ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড, মাদরাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ড মিলিয়ে মোট ১৮ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৫ জন শিক্ষার্থী এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় অংশ নেয়। এর মধ্যে পাস করেছে ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন এবং ফেল করেছে ছয় লাখ ৯০ হাজার ৬০৮ জন। মেধার সর্বোচ্চ সূচক জিপিএ ৫ পেয়েছে এক লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জন।
গত বছর, অর্থাৎ ২০২৫ সালে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় গড় পাসের হার ছিল ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ এবং জিপিএ ৫ পেয়েছিল এক লাখ ৩৯ হাজার ৩২ জন। পরিসংখ্যানে স্পষ্টত দেখা যায়, মাত্র এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার যেমন কমেছে, তেমনি জিপিএ ৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কমেছে ২২ হাজার ৩৫৬ জন। সাধারণ শিক্ষা বোর্ডগুলোতে পাসের হার ৬৪ দশমিক ০৫ শতাংশ, যা গত বছর ছিল ৬৮ দশমিক ০৪ শতাংশ। মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার মাত্র ৫৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে ৫৮ দশমিক ২০ শতাংশ।
বোর্ডভিত্তিক ফলাফলে দেখা যায়, পাসের হারে বোর্ডগুলোর মধ্যে শীর্ষে অবস্থান করছে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড। এই বোর্ডে পাসের হার ৭১ দশমিক ৬৩ শতাংশ। অন্য দিকে, সবচেয়ে কম পাসের হার রেকর্ড করা হয়েছে মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডে, যা ৫৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ। অন্যান্য সাধারণ বোর্ডের মধ্যে কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডে ৬৫ দশমিক ৪২ শতাংশ (জিপিএ ৫ পেয়েছে ৯ হাজার ৮১৪ জন), রাজশাহী বোর্ডে ৬৩ দশমিক ৬৭ শতাংশ, চট্টগ্রামে ৫৯ দশমিক ৪৮ শতাংশ, যশোরে ৬৬ দশমিক ২৭ শতাংশ, বরিশালে ৬০ দশমিক ৩৫ শতাংশ, সিলেটে ৫৮ দশমিক ৩৩ শতাংশ, দিনাজপুরে ৫৮ দশমিক ০৫ শতাংশ এবং ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৫৭ দশমিক ৩৯ শতাংশ।
মানবিক বিভাগে ১০০ জনে ফেল ৫১ জন
এবারের ফলাফলে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি এসেছে মানবিক বিভাগ থেকে। এ বিভাগে পাসের চেয়ে ফেলের সংখ্যাই বেশি, যা সার্বিক পাসের হারকে টেনে নিচে নামিয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মানবিক বিভাগ থেকে পরীক্ষা দেয়া প্রতি ১০০ জনের মধ্যে ৫১ জনের বেশি শিক্ষার্থীই পাসের মুখ দেখেনি।
মানবিক বিভাগ থেকে মোট ছয় লাখ ১৭ হাজার ৮৮৫ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল। এর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে মাত্র তিন লাখ এক হাজার ১৭৪ জন। অর্থাৎ, এই বিভাগে গড় পাসের হার মাত্র ৪৮ দশমিক ৭৪ শতাংশ এবং ফেল করেছে ৫১ দশমিক ২৬ শতাংশ শিক্ষার্থী। এর বিপরীতে বিজ্ঞান বিভাগে পাসের হার বেশ সন্তোষজনক ৮০ দশমিক ৬৪ শতাংশ। বিজ্ঞান বিভাগ থেকে পাঁচ লাখ ৬৬ হাজার ৯৫৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে প্রতি ১০০ জনে প্রায় ৮১ জন উত্তীর্ণ হয়েছে। অন্য দিকে, ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ থেকে দুই লাখ ১৯ হাজার ৬৯৬ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় বসেছিল, যার মধ্যে পাস করেছে এক লাখ ৪১ হাজার ২৪৮ জন। এই বিভাগে গড় পাসের হার ৬৪ দশমিক ২৯ শতাংশ।
ইংরেজি ও গণিতে দুর্বলতার খেসারত
বিষয়ভিত্তিক ফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে আটটিতেই গণিতের তুলনায় ইংরেজি বিষয়ে পাসের হার কম। ঢাকা, কুমিল্লা, রাজশাহী, যশোর, চট্টগ্রাম, বরিশাল, সিলেট ও ময়মনসিংহ- এই আট বোর্ডে ইংরেজির তুলনায় গণিতে বেশি শিক্ষার্থী পাস করেছে।
ময়মনসিংহ বোর্ডে ইংরেজিতে পাসের হার ৬৬ দশমিক ৬৪ শতাংশ, যেখানে গণিতে পাসের হার আরো বেশি। সিলেট বোর্ডে ইংরেজিতে পাস করেছে ৬৯ দশমিক ১১ শতাংশ এবং বরিশালে ৬৯ দশমিক ২৪ শতাংশ। যশোর বোর্ডে ইংরেজিতে পাসের হার ৭১ দশমিক ৮৪ শতাংশ, চট্টগ্রামে ৭২ দশমিক ২৭ শতাংশ এবং রাজশাহীতে ৭৪ দশমিক ৭০ শতাংশ। ঢাকা বোর্ডে ইংরেজিতে পাসের হার ৭৮ দশমিক ৪০ শতাংশ এবং কুমিল্লা বোর্ডে ৮১ দশমিক ২৯ শতাংশ। এসব বোর্ডেই গণিতের ফলাফল ইংরেজির চেয়ে ভালো। তবে ব্যতিক্রম কেবল দিনাজপুর বোর্ড, যেখানে ইংরেজিতে পাসের হার ৭২ দশমিক ৯১ শতাংশ হলেও গণিতে পাসের হার ৭১ দশমিক ০৫ শতাংশ।
শিক্ষাবিদদের মতে, প্রতি বছরই ইংরেজি ও গণিতে শিক্ষার্থীদের এই দুর্বলতা সামনে আসে। কিন্তু এবার পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসে পরীক্ষা হওয়া এবং খাতা মূল্যায়নে কঠোরতা অবলম্বন করার কারণে এই দুর্বলতার প্রকৃত চিত্রটি আরো নগ্নভাবে উন্মোচিত হয়েছে।
ছাত্রীদের অভাবনীয় সাফল্য, পিছিয়ে ছাত্ররা
ফলাফলের অবনমনের মধ্যেও একটি অত্যন্ত ইতিবাচক দিক হলো ছাত্রীদের অভাবনীয় সাফল্য। পাসের হার এবং জিপিএ ৫ প্রাপ্তি- উভয় ক্ষেত্রেই ছাত্রদের তুলনায় ছাত্রীরা অনেক বড় ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছে।
সার্বিকভাবে ছাত্রদের পাসের হার যেখানে ৫৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ, সেখানে ছাত্রীদের পাসের হার ৬৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ। অর্থাৎ, পাসের হারে ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা ৮ দশমিক ৮২ শতাংশ এগিয়ে। জিপিএ ৫ প্রাপ্তির ক্ষেত্রেও ৫২ হাজার ৭৮০ জন ছাত্রের বিপরীতে ৬৩ হাজার ৮৯৬ জন ছাত্রী জিপিএ ৫ পেয়েছে (ছাত্রদের তুলনায় ১১ হাজার ১১৬ জন বেশি)।
৯টি সাধারণ বোর্ডে ছয় লাখ ৬২ হাজার ৬৬৩ জন ছাত্র পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে তিন লাখ ৯৫ হাজার ৮১৪ জন (পাসের হার ৫৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ)। অন্য দিকে, সাত লাখ ৪১ হাজার ৮৭৬ জন ছাত্রী পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে পাঁচ লাখ তিন হাজার ৭৮৬ জন (পাসের হার ৬৭ দশমিক ৯১ শতাংশ)। সাধারণ বোর্ডে ছাত্রীদের মধ্যে জিপিএ ৫ পেয়েছে ৫৮ হাজার ৭০৫ জন, যেখানে ছাত্রদের সংখ্যা ৪৭ হাজার ৩০৪ জন।
মাদরাসা ও কারিগরি বোর্ডেও একই চিত্র। মাদরাসা বোর্ডে ছাত্রদের পাসের হার ৫১ দশমিক ৬৪ শতাংশ এবং ছাত্রীদের ৫৯ দশমিক ৮৯ শতাংশ। কারিগরি বোর্ডে ছাত্রদের ৫৫ দশমিক ১৯ শতাংশের বিপরীতে ছাত্রীদের পাসের হার ৬৭ দশমিক ৪৮ শতাংশ। সব বিভাগেই মেয়েদের এই ধারাবাহিক শ্রেষ্ঠত্ব দেখা গেছে।
শতভাগ পাসে ধস, শূন্য পাসের ছড়াছড়ি
এবার শতভাগ শিক্ষার্থী পাস করেছে- এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা মারাত্মকভাবে কমেছে এবং কেউ পাস করতে পারেনি এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বেড়েছে। এ বছর দেশের মোট ৩০ হাজার ৪০২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র ৬৬৯টি প্রতিষ্ঠানের শতভাগ শিক্ষার্থী পাস করেছে। অথচ গত বছর এই সংখ্যা ছিল ৯৮৪টি (অন্য একটি পরিসংখ্যানে দুই হাজার ৯৬৮টি উল্লেখ থাকলেও সার্বিকভাবে সংখ্যাটি উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে)। অন্য দিকে, ৩১২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থীই পাস করতে পারেনি বা শূন্য পাস করেছে। গত বছর শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ১৩৪টি।
সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে শূন্য শতাংশ পাস করা প্রতিষ্ঠান ৫৭টি (গত বছর ছিল ৪৮টি)। মাদরাসা বোর্ডে এই বিপর্যয় সবচেয়ে বেশি; সেখানে শূন্য শতাংশ পাস প্রতিষ্ঠান ২২৬টি (গত বছর ছিল ৮৬টি)। কারিগরি বোর্ডে শূন্য শতাংশ পাস প্রতিষ্ঠান ২৯টি, যা গত বছর একটিও ছিল না। দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এমন বিপুল বৈষম্য এবং প্রান্তিক পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানগুলোর এই বেহালদশা শিক্ষা প্রশাসনের জন্য বড় সতর্কবার্তা।
মন খুলে গান গাওয়া যায়, নম্বর দেয়া যায় না : শিক্ষামন্ত্রী
ফলাফলের এই অবনতি এবং বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর অকৃতকার্য হওয়া নিয়ে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন অত্যন্ত স্পষ্ট এবং কড়াবার্তা দিয়েছেন। তিনি মন্তব্য করেন, ‘মন খুলে গান গাওয়া যায়, নম্বর দেয়া যায় না।’
মূল্যায়ন পদ্ধতির বিষয়ে মন্ত্রী স্পষ্ট করেন যে, ৫ আগস্টের পর থেকে যে শিক্ষার্থী খাতায় যা লিখেছে, তাকে ঠিক সেই নম্বরই দেয়া হয়েছে। আগে পাসের হার বাড়ানোর জন্য অলিখিতভাবে নম্বর বাড়িয়ে দেয়ার যে প্রবণতা ছিল, এবার তা সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘এবারের পরীক্ষায় যে যা নম্বর পেয়েছে, সেটাই দেয়া হয়েছে। কেউ না পড়লে তাকে নম্বর পাইয়ে দিলে শিক্ষার বিস্তার হয় না।’
শিক্ষামন্ত্রী আরো জানান, ১৯৮০ সালের পাবলিক পরীক্ষা আইন সংশোধন করা হয়েছে। আগে খাতা পুনঃনিরীক্ষণের আবেদনে শুধু ট্যাবুলেশন শিট বা নম্বরের যোগফল দেখা হতো। কিন্তু এবার সংশোধিত আইন অনুযায়ী, যারা পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন করবেন, তাদের সম্পূর্ণ খাতা রিভিউ কমিটির সামনে আবার মূল্যায়ন করা হবে। এক্সাক্টলি প্রত্যেক ছাত্রছাত্রী যা প্রাপ্য, তাকে সেটাই দেয়া হবে। এখানে কোনো মানবিক বা ভুয়া নম্বরের সুযোগ নেই।
শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত তিনি যখন দায়িত্বে ছিলেন, তখন এই শূন্য পাসের সংখ্যা আরো তিন-চার গুণ বেশি ছিল। পরে ক্রমান্বয়ে তা কমিয়ে আনা হয়েছিল। এবারো সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে খারাপ করা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে এবং তাদের মানোন্নয়নে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।
শিক্ষাবিদদের বিশ্লেষণ : দীর্ঘদিনের ধ্বংসযজ্ঞের প্রতিচ্ছবি
পাসের হার কমার বিষয়টিকে শুধুমাত্র নেতিবাচক হিসেবে না দেখে, এটিকে শিক্ষাব্যবস্থার প্রকৃত অবস্থার একটি ‘রিয়েলিটি চেক’ হিসেবে দেখছেন শিক্ষাবিদরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোভিসি ড. মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এই ফলাফলকে দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের সঙ্কটের প্রতিচ্ছবি হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তার মতে, বিগত দীর্ঘ সময় ধরে শিক্ষাকে যেভাবে ধ্বংস করা হয়েছে, এবারের ফলাফল তারই ফসল। শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা থেকে দূরে সরে গেছে, যার পেছনে ডিজিটাল সংস্কৃতির নেতিবাচক প্রভাব, মোবাইল আসক্তি এবং পারিবারিক অসঙ্গতি দায়ী। যারা নিয়মিত পড়াশোনায় ছিল, তারা ভালো করেছে; আর যারা ফাঁকি দিয়েছে, তারা ঝরে পড়েছে।
গণিত ও ইংরেজির দুর্বলতা কাটাতে তিনি ট্র্যাডিশনাল কোচিংয়ের বদলে বিশেষ ‘রেমিডিয়াল সাপোর্ট’ বা প্রতিকারমূলক শিক্ষার ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, শুধু পরীক্ষার ফল প্রকাশ করে দায়িত্ব শেষ করলে হবে না। বোর্ডগুলোকে গণিত ও ইংরেজির শিক্ষকদের বিশেষ প্রশিক্ষণের আওতায় আনতে হবে এবং পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের চিহ্নিত করে তাদের জন্য সহায়ক ক্লাসের ব্যবস্থা করতে হবে।
কারিগরি শিক্ষার বিপর্যয় প্রসঙ্গে ড. জিন্নাহ বলেন, এই খাতের সমস্যা এক-দেড় বছরে সমাধান সম্ভব নয়। দক্ষ প্রশিক্ষকের অভাব, আধুনিক ল্যাব বা যন্ত্রপাতির সঙ্কট এবং শিক্ষার্থীদের গাইডেন্সের অভাবেই কারিগরি বোর্ডে এত বেশি ফেল। পুরো কারিগরি ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর পরামর্শ দেন তিনি।
একাদশে ভর্তিতে আসন সঙ্কট নেই
এসএসসির ফল প্রকাশের পর শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মূল চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়ায় একাদশ শ্রেণীতে ভর্তি। তবে এবার আসন সঙ্কট নিয়ে দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই। শিক্ষা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে সারা দেশের কলেজ ও মাদরাসাগুলোতে একাদশ শ্রেণীতে ভর্তির জন্য মোট আসন রয়েছে প্রায় ২৫ লাখ। এর বিপরীতে পাস করেছে মাত্র ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন। অর্থাৎ, সব শিক্ষার্থী ভর্তি হলেও অর্ধেকের বেশি আসন ফাঁকা পড়ে থাকবে।
আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান জানান, আগের মতোই লটারি বা ভর্তি পরীক্ষা ছাড়াই এসএসসি পরীক্ষার ফলের (জিপিএ) ভিত্তিতে একাদশে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হবে। আগামী ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ভর্তি কার্যক্রম শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে দেশে সামগ্রিকভাবে আসন বেশি থাকলেও প্রথম সারির ও নামিদামি কলেজগুলোতে ভর্তির ক্ষেত্রে তীব্র প্রতিযোগিতা হবে। ঢাকা বা অন্যান্য বড় শহরের ভালো কলেজগুলোতে নির্ধারিত আসনের চেয়ে আবেদনকারী বেশি থাকায়, জিপিএ এবং পছন্দক্রমের ওপর ভিত্তি করেই আসন বরাদ্দ দেয়া হবে। তাই কলেজ নির্বাচনের সময় শিক্ষার্থীদের নিজেদের যোগ্যতা ও ফলের সাথে সামঞ্জস্য রেখে সতর্কতার সাথে পছন্দক্রম নির্ধারণ করার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কলেজের অধ্যক্ষরা।
পরীক্ষা ব্যবস্থাপনায় নতুনত্ব ও প্রযুক্তির ব্যবহার
এবারের এসএসসি পরীক্ষা ব্যবস্থাপনায় বেশ কিছু নতুন ও ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়। শতভাগ স্বচ্ছতা নিশ্চিতে সব পরীক্ষা কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করে কেন্দ্রীয়ভাবে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে মনিটরিং করা হয়। এ ছাড়া অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি এড়াতে কেন্দ্রের প্রবেশদ্বারে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের ‘বডি-ওর্ন ক্যামেরা’ বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। বিশেষভাবে সক্ষম (প্রতিবন্ধী) পরীক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বা যাদের হাত নেই, তাদের জন্য শ্রুতিলেখক এবং অতিরিক্ত ৪৫ মিনিট সময় বরাদ্দ ছিল। এ ছাড়া অটিস্টিক, ডাউন সিনড্রোম ও সেরিব্রাল পালসি আক্রান্ত পরীক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষক বা অভিভাবকের বিশেষ সহায়তায় পরীক্ষা দেয়ার মানবিক সুযোগটি রাখা হয়।
ফলাফল জানার পদ্ধতিতেও এবার প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন করা হয়েছে। সাধারণ পরীক্ষার্থীরা অনলাইনের পাশাপাশি মুঠোফোনে এসএমএসের মাধ্যমে ফল জানতে পারছেন। ১৬২২২ নম্বরের পাশাপাশি এবার নতুন করে ১৬১৪০ নম্বরেও এসএমএস পাঠিয়ে দ্রুত ফলাফল জানার ব্যবস্থা করেছে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড।
রাজশাহী বোর্ডে ৭ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পাস
রাজশাহী ব্যুরো জানায়, রাজশাহী মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ডে এবারের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে বড় ধরনের অবনতি হয়েছে। এ বোর্ডে পাসের হার ৬৩ দশমিক ৬৭ শতাংশ, যা গত সাত বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। গত বছর পাসের হার ছিল ৭৭ দশমিক ৬৬ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে ১৩ দশমিক ৯৯ শতাংশ।
এ বছরের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়ার জন্য রাজশাহী বোর্ডের অধীনে এক লাখ ৭৮ হাজার ৯৫২ জন শিক্ষার্থী নিবন্ধিত ছিল। এর মধ্যে পরীক্ষায় অংশ নেয় এক লাখ ৭৬ হাজার ৪৪ জন। অনুপস্থিত ছিল দুই হাজার ৯০৮ জন। অংশ নেয়া পরীক্ষার্থীদের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে প্রায় এক লাখ ১২ হাজার জন।
বোর্ডের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে পাসের হার ছিল ৭৭ দশমিক ৬৬ শতাংশ। এর আগে ২০২৪ সালে ৮৯ দশমিক ২৬ শতাংশ, ২০২৩ সালে ৮৭ দশমিক ৮৯ শতাংশ, ২০২২ সালে ৮৫ দশমিক ৮৮ শতাংশ, ২০২১ সালে ৯৪ দশমিক ৯১ শতাংশ এবং ২০২০ সালে ৯০ দশমিক ৭৯ শতাংশ শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়েছিল। এ হিসাবে গত সাত বছরের মধ্যে এবারই রাজশাহী বোর্ডে পাসের হার সবচেয়ে কম।
এগিয়ে ছাত্রীরা : এবারের ফলাফলে ছাত্রদের তুলনায় ছাত্রীরা উল্লেখযোগ্যভাবে ভালো করেছে। ছাত্রীদের পাসের হার ৭০ দশমিক ৭৩ শতাংশ। বিপরীতে ছাত্রদের পাসের হার ৫৭ দশমিক ৩৩ শতাংশ। অর্থাৎ পাসের হারে ছাত্রীরা ১৩ দশমিক ৪০ শতাংশ পয়েন্ট এগিয়ে রয়েছে। জিপিএ-৫ পাওয়ার ক্ষেত্রেও ছাত্রীরা এগিয়ে। এ বছর মোট ১৬ হাজার ১১৩ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে। তাদের মধ্যে আট হাজার ৯৯১ জন ছাত্রী এবং সাত হাজার ১২২ জন ছাত্র।
বিদ্যালয়ভিত্তিক ফলাফলেও এবার বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা গেছে। এ বছর রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের মাত্র ৩৫টি বিদ্যালয়ের শতভাগ শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়েছে। অথচ গত বছর ৯৯টি বিদ্যালয়ের শতভাগ শিক্ষার্থী পাস করেছিল। এর আগে ২০২৪ সালে ২৮৯টি, ২০২৩ সালে ১৭৮টি, ২০২২ সালে ১৪৭টি, ২০২১ সালে ৩৬৮টি এবং ২০২০ সালে ৩০৮টি বিদ্যালয়ে শতভাগ শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়েছিল।
তবে ফলাফলের এই বড় পতনকে ‘বিপর্যয়’ হিসেবে দেখতে নারাজ রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. শামীম আরা চৌধুরী। তার দাবি, এবারের ফলাফলকে খারাপ বলা যাবে না; বরং এটিই মানসম্মত বা স্ট্যান্ডার্ড রেজাল্ট। তিনি বলেন, ‘সবাই তো ঠিকমতো পড়াশোনা করে না। পড়ে পাস করলে এরকমই ফলাফল হওয়ার কথা।’ তার মতে, বর্তমান সরকার সংখ্যার চেয়ে শিক্ষার গুণগত মান বা ‘কোয়ালিটি’র ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
সিলেট বোর্ডে দেশের সর্বনিম্ন পাসের হার
সিলেট ব্যুরো জানায়, সিলেট বোর্ডে এবারের এসএসসির ফলাফলে বড় ধরনের ধস নেমেছে। গত পাঁচ বছরের মধ্যে এবারই সর্বনিম্ন পাসের হার হয়েছে। এ বছর সিলেট বোর্ডে পাসের হার ৫৮ দশমিক ৩৩ শতাংশ। গত বছর ছিল ৬৮ দশমিক ৫৭ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে ১০ দশমিক ২৪ শতাংশীয় পয়েন্ট। তবে পাসের হার কমলেও বেড়েছে জিপিএ-৫। এবার তিন হাজার ৮৩৬ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে। গত বছর এ সংখ্যা ছিল তিন হাজার ৬১৪।
সোমবার সকালে সিলেট বোর্ডের ফলাফল ঘোষণা করেন পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর বিলকিস ইয়াসমিন।
প্রকাশিত ফলাফল অনুযায়ী, এবার মোট ৮৯ হাজার ৭৯ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়। এর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ৫১ হাজার ৯৫৭ জন। পাস করা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছেলে ১৯ হাজার ৮৮৯ জন এবং মেয়ে ৩২ হাজার ৬৮ জন। ছেলেদের পাসের হার ৫৬ দশমিক ১২ শতাংশ এবং মেয়েদের ৫৯ দশমিক ৭৮ শতাংশ। অর্থাৎ ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের পাসের হার ৩ দশমিক ৬৬ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি।
পাঁচ বছরে ধারাবাহিক পতন : সিলেট বোর্ডের পাঁচ বছরের তুলনামূলক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২২ সালে পাসের হার ছিল ৭৮ দশমিক ৮২ শতাংশ। ২০২৩ সালে তা কমে হয় ৭৬ দশমিক ০৬ শতাংশ, ২০২৪ সালে ৭৩ দশমিক ৩৫ শতাংশ এবং ২০২৫ সালে ৬৮ দশমিক ৫৭ শতাংশ। এবার তা আরো কমে হয়েছে ৫৮ দশমিক ৩৩ শতাংশ। অর্থাৎ ২০২২ সালের তুলনায় পাঁচ বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে ২০ দশমিক ৪৯ শতাংশীয় পয়েন্ট।
অন্য দিকে জিপিএ-৫ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে চিত্রটি ভিন্ন। ২০২২ সালে সাত হাজার ৫৬৫ জন জিপিএ-৫ পেলেও ২০২৩ সালে তা কমে পাঁচ হাজার ৪৫২ এবং ২০২৪ সালে পাঁচ হাজার ৪৭১ জনে দাঁড়ায়। ২০২৫ সালে জিপিএ-৫ আরো কমে হয় তিন হাজার ৬১৪ জন। এবার সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে তিন হাজার ৮৩৬ জনে।
বিজ্ঞান বিভাগে ভালো, মানবিকে তলানিতে : এবার বিজ্ঞান বিভাগে পাসের হার ৮০ দশমিক ৩২ শতাংশ। এ বিভাগে ২৫ হাজার ৯৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ২০ হাজার ১৫৯ জন।
ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে পাসের হার ৬৪ দশমিক ০৩ শতাংশ। ছয় হাজার ২২১ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে তিন হাজার ৯৮৩ জন। তবে মানবিক বিভাগে ফলাফল সবচেয়ে খারাপ। এ বিভাগে পাসের হার মাত্র ৪৮ দশমিক ১৬ শতাংশ। ৫৭ হাজার ৭৬০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ২৭ হাজার ৮১৫ জন। অর্থাৎ মানবিক বিভাগের অর্ধেকেরও বেশি পরীক্ষার্থী পাস করতে পারেনি।
সিলেটে সর্বোচ্চ, সুনামগঞ্জে সর্বনিম্ন : জেলাভিত্তিক ফলাফলে সিলেট জেলায় পাসের হার সর্বোচ্চ। এ জেলায় ৩৫ হাজার ২৪০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ২২ হাজার ১৬০ জন। পাসের হার ৬২ দশমিক ৮৮ শতাংশ। এ জেলা থেকে সর্বোচ্চ দুই হাজার ২৩ জন জিপিএ-৫ পেয়েছে। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে মৌলভীবাজার। ১৯ হাজার ৮৫৬ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ১১ হাজার ১০৩ জন পাস করেছে। পাসের হার ৫৫ দশমিক ৯২ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৭২৫ জন। হবিগঞ্জে ১৫ হাজার ৬৯৪ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে আট হাজার ৬৯৫ জন। পাসের হার ৫৫ দশমিক ৪০ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে ৬৭৫ জন।
সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে সুনামগঞ্জ। জেলায় ১৮ হাজার ২৮৯ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ৯ হাজার ৯৯৯ জন। পাসের হার ৫৪ দশমিক ৬৭ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৪১৩ জন।
এ দিকে পাসের হার ব্যাপকভাবে কমলেও শতভাগ পাস করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কিছুটা বেড়েছে। এবার সিলেট বোর্ডে ৯টি প্রতিষ্ঠান থেকে শতভাগ শিক্ষার্থী পাস করেছে। গত বছর এ সংখ্যা ছিল সাতটি। তবে কোনো প্রতিষ্ঠানের পাসের হার শূন্য হয়নি।
কুমিল্লা বোর্ডে পাসের হার ৬৫.৪২
কুমিল্লা প্রতিনিধি জানান, কুমিল্লা বোর্ডে এসএসসিতে পাসের হার ৬৫ দশমিক ৪২ শতাংশ। গড় পাসের হার ও জিপিএ-৫ প্রাপ্তিতে তিন বিভাগেই ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা এগিয়ে রয়েছে। গতকাল সংবাদ সম্মেলনে ফলাফল ঘোষণা করেন বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর ড. মো: শফিকুল ইসলাম।
প্রকাশিত ফলাফলে দেখা গেছে, এ বছর বোর্ডে জিপিএ-৫ পেয়েছে মোট ৯ হাজার ৮১৪ জন শিক্ষার্থী। এর মধ্যে পাঁচ হাজার ৮৪৮ জন মেয়ে এবং তিন হাজার ৯৬৬ জন ছেলে। গত বছর এ বোর্ডে পাসের হার ছিল ৬৩ দশমিক ৬০ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছিল ৯ হাজার ৯০২ জন। অর্থাৎ গত বছরের তুলনায় এবার পাসের হার বাড়লেও জিপিএ-৫ প্রাপ্তির সংখ্যা কমেছে ৮৮ জন।
কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের অধীন ছয় জেলার এক হাজার ৮২৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে এবার এক লাখ ৪৫ হাজার ৮৩৫ জন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়। তাদের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ৯৫ হাজার ৩৯৯ জন। পাস করা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৩৭ হাজার ২০৩ জন ছেলে এবং ৫৮ হাজার ১৯৬ জন মেয়ে। পাসের হারে মেয়েরা ছেলেদের তুলনায় ৩ দশমিক ৬৪ শতাংশ পয়েন্ট এগিয়ে রয়েছে।
বিজ্ঞান বিভাগে পাসের হার সবচেয়ে বেশি ৮২ দশমিক ৮৮ শতাংশ। এ বিভাগে ছেলেদের পাসের হার ৮১ দশমিক ৬৬ শতাংশ এবং মেয়েদের ৮৩ দশমিক ৭৭ শতাংশ। মানবিক বিভাগে পাসের হার ৫০ দশমিক ৬১ শতাংশ। এ বিভাগে ছেলেদের পাসের হার ৪৫ দশমিক ০৫ শতাংশ এবং মেয়েদের ৫২ দশমিক ২৫ শতাংশ।
অন্য দিকে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে পাসের হার ৫৭ দশমিক ৪০ শতাংশ। এ বিভাগে ছেলেদের পাসের হার ৫২ দশমিক ৪৪ শতাংশ এবং মেয়েদের ৬৩ দশমিক ৮২ শতাংশ। এ বছর কুমিল্লা বোর্ডে শতভাগ পাস করেছে এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ২৪টি। গত বছর ছিল ২২টি।
ময়মনসিংহ বোর্ডে পাসের হার ৫৭.৩৯
ময়মনসিংহ অফিস জানায়, এসএসসির ফলাফলে ময়মনসিংহ বোর্ডে পাসের হার ৫৭ দশমিক ৩৯ শতাংশ। এবার ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিতে ফরম পূরণ করেছিলেন এক লাখ ৯ হাজার ৬১৬ জন পরীক্ষার্থী। এর মধ্যে পরীক্ষায় অংশ নেয় এক লাখ পাঁচ হাজার ২৮ জন। তাদের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন ৬০ হাজার ২৭৪ জন।
ফলাফলে ছাত্রদের তুলনায় ছাত্রীরা এগিয়ে রয়েছে। ছাত্রদের পাসের হার ৫২ দশমিক ৬৬ শতাংশ। অন্য দিকে ছাত্রীদের পাসের হার ৬২ দশমিক ৩৭ শতাংশ। এবার এ বোর্ডে জিপিএ-৫ পেয়েছে পাঁচ হাজার ৭০০ জন। এর মধ্যে ছাত্র দুই হাজার ৬২১ জন এবং ছাত্রী তিন হাজার ৭৯ জন।
বিভাগভিত্তিক ফলাফলে সবচেয়ে ভালো করেছে বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীরা। এ বিভাগে পাসের হার ৭৯ দশমিক ৬৭ শতাংশ। মানবিক বিভাগে পাসের হার ৪৬ দশমিক ১২ শতাংশ এবং ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে ৪৮ দশমিক ৯১ শতাংশ।
জেলাভিত্তিক ফলাফলে সবচেয়ে বেশি পাসের হার নেত্রকোনা জেলায়। এ জেলায় পাসের হার ৬০ দশমিক ৪৯ শতাংশ। ময়মনসিংহ জেলায় ৫৭ দশমিক ৮০ শতাংশ, জামালপুরে ৫৫ দশমিক ৬০ শতাংশ এবং শেরপুরে ৫৫ দশমিক ৪১ শতাংশ পরীক্ষার্থী পাস করেছে। এবার ১০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শতভাগ পরীক্ষার্থী পাস করেছে। তবে চারটি প্রতিষ্ঠানের কোনো পরীক্ষার্থীই উত্তীর্ণ হতে পারেনি।
পাস কমেছে যশোর বোর্ডে
যশোর অফিস জানায়, এবারো এসএসসির ফলে যশোর বোর্ডে অবনতি হয়েছে। পাসের হার নেমে এসেছে ৬৬ দশমিক ২৭ শতাংশে। গত বছর ছিল ৭৩ দশমিক ৬৯ শতাংশ। এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে ৭ দশমিক ৪২ শতাংশ। একই সাথে কমেছে জিপিএ-৫ পাওয়ার সংখ্যাও। এবার যশোর শিক্ষা বোর্ডে জিপিএ-৫ পেয়েছে ১১ হাজার ৪৭৮ জন শিক্ষার্থী। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ১৫ হাজার ৪১৯ জন। অর্থাৎ জিপিএ-৫ কমেছে তিন হাজার ৯৪১টি। যশোর বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক এস এম হোসেন আলী ফলাফল প্রকাশ করেন।
ফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৪ সালে পাসের হার ছিল ৯২ দশমিক ৩২ শতাংশ। পরের বছর ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৭৩ দশমিক ৬৯ শতাংশে। আর এবার ২০২৬ সালে আরো কমে হয়েছে ৬৬ দশমিক ২৭ শতাংশ। অর্থাৎ মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে ২৬ দশমিক ৫ শতাংশ পয়েন্ট।
জিপিএ-৫ পাওয়ার ক্ষেত্রেও একই চিত্র। ২০২৪ সালে ২০ হাজার ৭৬১ জন, ২০২৫ সালে ১৫ হাজার ৪১৯ জন এবং ২০২৬ সালে মাত্র ১১ হাজার ৪৭৮ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে।
২০২৬ সালে যশোর শিক্ষা বোর্ডের আওতাধীন খুলনা বিভাগের ১০ জেলায় এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয় এক লাখ ৩২ হাজার ৯৪০ জন শিক্ষার্থী। এর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ৮৮ হাজার ৯৭ জন। উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৩৯ হাজার ৬৩৪ জন ছেলে এবং ৪৮ হাজার ৪৬৩ জন মেয়ে।
দিনাজপুর বোর্ডে সব সূচক নিম্নগামী
দিনাজপুর প্রতিনিধি জানান, দিনাজপুর বোর্ডে এসএসসিতে ছয় বছরের মধ্যে এবার সর্বনিম্ন পাশের হার অর্জন করেছে। সব সূচকেই বিগত বছরগুলোর থেকে এবারের অর্জন নিম্নমুখী। প্রকাশিত ফলাফলে শতকরা ৫৮.০৫ শতাংশ দিনাজপুর বোর্ডে পাস করেছে। এবার মোট পরীক্ষার্থী ছিল এক লাখ ৮৩ হাজার ৬৯৪ জন। পাস করেছে এক লাখ চার হাজার ৯২৫ জন। জিপিএ-৫ পেয়েছে ১৩ হাজার ৬৩৯ জন। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ১৫ হাজার আটজন। কেউ পাশ করতে পারেনি এমন স্কুলের সংখ্যা ১৮ টি। গত বছর পাস না করা স্কুলের সংখ্যা ছিল ১৩টি। এ ছাড়া শতভাগ পাস করেছে এমন স্কুলের সংখ্যা ২৪টি। গত বছরে শতভাগ পাশ করা স্কুলের সংখ্যা ছিল ৪৮টি।
বরিশাল বোর্ডে পাসের হার বাড়লেও জিপিএ-৫ কমেছে
বরিশাল ব্যুরো জানায়, বরিশাল শিক্ষা বোর্ডে এবার পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৬০ দশমিক ৩৫ শতাংশ। এ বছর জিপিএ-৫ পেয়েছে দুই হাজার ৭৭৮ জন শিক্ষার্থী। গত বছরের তুলনায় পাসের হার বাড়লেও কমেছে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা। বরিশাল বোর্ডের ছয় জেলার মধ্যে পাসের হারে এবারো শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে পিরোজপুর। অন্যদিকে সবচেয়ে কম পাসের হার ভোলা জেলায়।
প্রকাশিত ফলাফলের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এ বছর বরিশাল বোর্ডের অধীনে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয় মোট ৮০ হাজার ৪৫৮ জন শিক্ষার্থী।পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে ৪৮ হাজার ৫৫৫ জন। উত্তীর্ণদের মধ্যে ছাত্র ১৯ হাজার ৯৫৫ জন এবং ছাত্রী ২৮ হাজার ৬০০ জন। পাসের হার ও জিপিএ-৫ দুই ক্ষেত্রেই ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা এগিয়ে রয়েছে।
গত বছর বরিশাল বোর্ডে পাসের হার ছিল ৫৬ দশমিক ৩৮ শতাংশ। এবার তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬০ দশমিক ৩৫ শতাংশে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার বেড়েছে ৩ দশমিক ৯৭ শতাংশ। তবে পাসের হার বাড়লেও জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে। এবার মোট দুই হাজার ৭৭৮ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে।
এবার বরিশাল বোর্ডের অধীন এক হাজার ৫১৫টি বিদ্যালয়ের মধ্যে মাত্র ১৫টি বিদ্যালয়ের সব পরীক্ষার্থী পাস করেছে। গত বছর শতভাগ পাস করা বিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল ১৭টি। অর্থাৎ এবার শতভাগ পাস করা বিদ্যালয়ের সংখ্যা কমেছে দু’টি।
শতভাগ পাস করা ১৫ বিদ্যালয়ের মধ্যে বরিশাল জেলায় সাতটি, পিরোজপুরে তিনটি, বরগুনায় দু’টি, ভোলায় দু’টি এবং ঝালকাঠিতে একটি বিদ্যালয় রয়েছে। পটুয়াখালী জেলায় কোনো বিদ্যালয় শতভাগ পাসের তালিকায় নেই।
বোর্ডের তথ্যমতে, ৯৩৯টি বিদ্যালয়ে ৫০ শতাংশের বেশি থেকে শতভাগের নিচে শিক্ষার্থী পাস করেছে। আর ৫৫৬টি বিদ্যালয়ে পাসের হার ৫০ শতাংশের নিচে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের তিন জেলার পাঁচটি বিদ্যালয় থেকে এবার কোনো শিক্ষার্থীই পাস করতে পারেনি। এর মধ্যে বরিশাল জেলার দু’টি, ঝালকাঠির দু’টি এবং পিরোজপুর জেলার একটি বিদ্যালয় রয়েছে।